সোমবার, ০৮ Jun ২০২৬, ১১:৫৭ অপরাহ্ন

বাজেটের ‘হাতি মার্কা’ আকার, সক্ষমতায় ধুঁকছে রাষ্ট্র

বিশেষ প্রতিনিধি, অর্থনীতি ডেস্ক ॥
ঢাকা: প্রতি বছর জুনে দেশের ইতিহাসের ‘সর্ববৃহৎ’ বাজেট ঘোষণার মধ্য দিয়ে যে অর্থ-রাজনৈতিক ডামাডোল তৈরি হয়, তার পেছনে লুকিয়ে থাকে এক রূঢ় বাস্তব সত্য। গত এক দশকে বাংলাদেশের বাজেটের আকার প্রায় ২.৬৮ গুণ বৃদ্ধি পেলেও, সেবা প্রদান এবং অর্থনৈতিক সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের প্রকৃত সক্ষমতা ততটুকুই পিছিয়েছে। অর্থনীতিবিদদের স্পষ্ট অভিমত- কেবল সংখ্যাতাত্ত্বিক বাজেটের অঙ্ক বড় হওয়াই একটি দেশের প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত সক্ষমতা বাড়ার প্রমাণ নয়।

প্রবৃদ্ধির বিপরীত স্রোত এবং গুণগত মানের ঘাটতি
উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দেশের বাজেটের আকার ছিল ২ লাখ ৯৫ হাজার ১০০ কোটি টাকা, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এসে দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকায়। তবে একই সমান্তরালে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়েনি, উল্টো সংকুচিত হয়েছে। এক দশকের ব্যবধানে ৭.১১ শতাংশের প্রবৃদ্ধি এখন ৩.৯৭ থেকে ৪.৮০ শতাংশের বৃত্তে ওঠানামা করছে। এটি নির্দেশ করে যে, বাজেটের মান, প্রকল্প বাস্তবায়নের কার্যকারিতা এবং গুণগত ব্যয় নিশ্চিত না করে কেবল আকার বড় করা হলে তা টেকসই কোনো উন্নয়ন বয়ে আনে না।

মাথাপিছু আয়ের আড়ালে বৈষম্য ও ভঙ্গুর মানব উন্নয়ন
গত ১০ বছরে দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৩৮২ মার্কিন ডলার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২ হাজার ৮২০ ডলারে উন্নীত হয়েছে। এই গড় পরিসংখ্যানটি আপাতদৃষ্টিতে ইতিবাচক মনে হলেও, সাধারণ মানুষের জীবনমানে এর কোনো সুদূরপ্রসারী প্রতিফলন নেই। বিশেষ করে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষা খাতের নাজুক পরিস্থিতি দেশের সার্বিক মানব উন্নয়নের সীমাবদ্ধতাকে উন্মুক্ত করে দেয়। অতি সম্প্রতি ভোলার শিশু তাকরিমের করুণ ঘটনাই প্রমাণ করে যে, দেশের তৃণমূল পর্যায়ে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার মান কতটা আশঙ্কাজনক স্তরে রয়েছে। আয় বাড়লেও যদি তার সুফল ও জনসেবা সবার দোরগোড়ায় না পৌঁছায়, তবে সেই আয় বৃদ্ধি কেবলই শুভঙ্করের ফাঁকি।

দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন রাষ্ট্রীয় ব্যয়-জিডিপি অনুপাত
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে সরকারি ব্যয় জিডিপির মাত্র ১২.৩ শতাংশ; যা দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশীদের তুলনায় সর্বনিম্ন। যেখানে ভারতে এই অনুপাত ২৮.৩৮ শতাংশ, ভুটানে ২৭.১৩ শতাংশ, পাকিস্তানে ১৯.৪৭ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কায় ১৯.৩২ শতাংশ। একটি আধুনিক রাষ্ট্রের সক্ষমতা ও জনগণের প্রতি তার দায়বদ্ধতা পরিমাপের প্রধান নির্দেশক হলো এই অনুপাত। বাংলাদেশে এই সূচক এত নিচে থাকার অর্থ হলো- স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অবকাঠামো ও সামাজিক নিরাপত্তায় রাষ্ট্রের কল্যাণমূলক হস্তক্ষেপের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত, যা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে দুর্বল করে রাখছে।

গভীর রাজস্ব সংকট: সমস্যার মূল উৎস
ব্যয় করার সামর্থ্য না থাকার মূল কারণ হলো সরকারের নিজস্ব আয় তথা রাজস্ব আদায়ের তীব্র সংকট। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে আমাদের কর-জিডিপি অনুপাত ছিল ৯.৬ শতাংশ, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উদ্বেগজনকভাবে হ্রাস পেয়ে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬.৭ থেকে ৭.১ শতাংশে। বিপুল অর্থনীতির এই দেশে বর্তমানে ১ কোটি ৪৫ লাখ টিআইএনধারী থাকলেও নিয়মিত আয়কর রিটার্ন জমা দেন মাত্র ৪৫ লাখ মানুষ। অর্থাৎ, ১০ কোটিরও বেশি কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর দেশে করদাতার সংখ্যা মাত্র ৩৫-৪০ লাখের ঘরে। সংকুচিত করজাল, উচ্চ মাত্রার কর ফাঁকি এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাঠামোগত দুর্বলতাই এর জন্য দায়ী। এই প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন,

“কেবল প্রবৃদ্ধি দিয়ে রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন একটি সুশৃঙ্খল ও কার্যকর রাজস্ব ব্যবস্থা।”

অর্থ বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবায়নে প্রশাসনিক অদক্ষতা
অর্থবছরের শেষে দেখা যায়, বরাদ্দকৃত অর্থও সরকার সময়মতো ও দক্ষতার সাথে ব্যয় করতে পারে না। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) মোট বরাদ্দ ছিল ২ লাখ ২৬strings ১৬৪ কোটি টাকা, কিন্তু বছর শেষে প্রকৃত ব্যয় হয়েছে মাত্র ১ লাখ ৫৩ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা। ফলে বছর শেষে ৭২ হাজার ৭১৪ কোটি টাকাই অব্যবহৃত থেকে গেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে এডিপি বাস্তবায়নের হার মাত্র ৪১.৪১ শতাংশ। এটি শুধু প্রশাসনিক শ্লথতা নয়, বরং রাষ্ট্রের প্রকল্প বাস্তবায়নের এক চরম প্রাতিষ্ঠানিক অদক্ষতা। তদুপরি, পদ্মা সেতু বা মাতারবাড়ি বন্দরের মতো মেগা প্রকল্পগুলোর দফায় দফায় সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিদেশি ঋণের অর্থ ব্যবহারে ধীরগতি দেশের সামগ্রিক অর্থ ব্যবস্থাপনার দুর্বল চিত্রকে স্পষ্ট করে তোলে।

স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় চরম অবহেলা
সামাজিক খাতের গুরুত্বপূর্ণ দুটি স্তম্ভ- স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় বাংলাদেশের সরকারি বিনিয়োগ বৈশ্বিক মানদণ্ড তো বটেই, আঞ্চলিক সূচকেও তলানিতে। স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয় জিডিপির মাত্র ২.৩৬ শতাংশ, যেখানে ভারতে ৩.৩৪ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ৩.৬৮ শতাংশ, ভুটানে ৪.৪২ শতাংশ এবং নেপালে ৬.১৬ শতাংশ। শিক্ষা খাতেও বরাদ্দের পরিমাণ জিডিপির ১.৫ থেকে ২ শতাংশের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। মানবসম্পদ উন্নয়নে দীর্ঘদিনের এই বিনিয়োগহীনতা ও অবহেলারই চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ হলো ভোলার শিশু তাকরিমের মৃত্যুর মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাগুলো।

উত্তরণের উপায় ও নীতি-পরামর্শ
অর্থনৈতিক এই স্থবিরতা ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার সংকট দূর করতে অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা প্রধানত কয়েকটি সুনির্দিষ্ট সংস্কারের তাগিদ দিয়েছেন:

রাজস্ব সংস্কার: করজালের পরিধি দ্রুত সম্প্রসারণ করতে হবে, এনবিআরের আধুনিকায়ন ও সংস্কার নিশ্চিত করার পাশাপাশি কর ফাঁকি ও যত্রতত্র কর অব্যাহতি দেওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে।

প্রকল্পে সুশাসন: নতুন প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে জাতীয় অগ্রাধিকার নিরূপণ, অহেতুক ব্যয় বৃদ্ধির প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ এবং কঠোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা আবশ্যক।

প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধি: আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস করে সময়মতো অর্থ ছাড় ও বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির শতভাগ গুণগত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

সামাজিক খাতে বিনিয়োগ: মানবসম্পদকে দক্ষ করতে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বরাদ্দ বাড়িয়ে দ্রুত জিডিপির অন্তত ৫ থেকে ৬ শতাংশে উন্নীত করা প্রয়োজন।

বৈদেশিক ঋণের সুষ্ঠু ব্যবহার: যেকোনো বিদেশি ঋণ গ্রহণের আগে তা বাস্তবায়নের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা যাচাই করা জরুরি, যাতে অব্যবহৃত ঋণের বিপরীতে সুদ পরিশোধের বাড়তি বোঝা জনগণের ঘাড়ে না চাপে।

শেষ কথা
বিগত এক দশকে দেশের বাজেটের আকার কাগজে-কলমে প্রায় তিন গুণ বৃদ্ধি পেলেও রাজস্ব আহরণের ব্যর্থতা, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে চরম অদক্ষতা এবং মৌলিক সেবা খাতে বিনিয়োগের অভাবে রাষ্ট্রের প্রকৃত সক্ষমতা বাড়েনি।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, উন্নয়নের আসল মাপকাঠি কখনোই বাজেটের বিশাল অঙ্ক হতে পারে না। আসল বিষয় হলো- সেই অর্থ কোন উৎস থেকে আসছে, তা কতটা স্বচ্ছতা ও দক্ষতার সাথে ব্যয় করা হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষ তার সুফল কতটুকু পাচ্ছে। তাই বর্তমান প্রেক্ষাপটে নীতিনির্ধারকদের কাছে মূল প্রশ্ন ‘বাজেট কত বড়?’ তা হওয়া উচিত নয়, বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত ‘রাষ্ট্র জনগণের সেবায় কতটা সক্ষম?’ এই প্রশ্নের সঠিক উত্তরের ওপরেই নির্ভর করছে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সুশাসন ও টেকসই অর্থনৈতিক বিকাশ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2024  Ekusharkantho.com
Technical Helped by Curlhost.com